শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
কৃষি প্রবাহ

এবারও আলু নিয়ে বিপাকে রংপুরের কৃষক

জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৫:০৯ পিএম
এবারও আলু নিয়ে বিপাকে রংপুরের কৃষক আলু নিয়ে বিপাকে কৃষক ১২ বছরের ৭ বছরই লস
রংপুর অঞ্চলের কৃষকদের কাছে একসময় আলু ছিল অন্যতম লাভজনক ও নগদ অর্থের ফসল। মৌসুম শেষে আলু বিক্রির অর্থ দিয়ে অনেক পরিবার সারা বছরের প্রয়োজন মেটাত। তবে গত এক যুগে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে ন্যায্যমূল্যের অভাব এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় সেই চিত্র বদলে গেছে। টানা লোকসানে অনেক কৃষকের কাছে এখন আলু চাষই হয়ে উঠেছে বড় ঝুঁকির বিষয়।
কৃষকদের ভাষ্য, সার, বীজ, শ্রমিক ও অন্যান্য উপকরণের দাম বাড়ায় আলু উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাজারদর বাড়েনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমিত হিমাগার সুবিধা ও দুর্বল বিপণনব্যবস্থা। ফলে প্রতিবছরই উৎপাদিত আলু নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ছেন তাঁরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য এবং রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বার্ষিক বাজার পর্যালোচনা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের মধ্যে ৭ বছরই আলু চাষ করে লোকসান গুনেছেন কৃষকেরা। লাভের বছর ছিল ২০১৬, ২০১৯, ২০২০, ২০২৩ ও ২০২৪। অন্যদিকে ২০১৪, ২০১৫, ২০১৭, ২০১৮, ২০২১, ২০২২ ও ২০২৫ সালে আলু চাষে লোকসান হয়েছে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বলেন, গত বছর রংপুরের আট উপজেলার কৃষকেরা প্রায় চার লাখ বস্তা আলু হিমাগার থেকে আর তুলতে পারেননি। এতে কৃষকদের প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং হিমাগার মালিকদের প্রায় দুই কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। এবারও একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, এ সংকট মোকাবিলায় রংপুরে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, রপ্তানি প্রণোদনা এবং আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা স্থাপন প্রয়োজন।
রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সহসম্পাদক মোবারক হোসেন মনছুর বলেন, কৃষকদের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে সরকারের নীতিগত সহায়তা জরুরি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে ৩৩ শতাংশ মূল্যসহায়তা যোগ করে আলুর দাম নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এদিকে নতুন মৌসুমে আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়েছে। বর্তমানে হিমাগার পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু ১১ থেকে ১৩ টাকায় এবং খুচরা বাজারে ১৪ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রংপুর অঞ্চলে দেশের মোট আলু উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ হয়ে থাকে। অথচ উৎপাদিত আলুর মাত্র ২২ শতাংশ সংরক্ষণের মতো হিমাগার সুবিধা রয়েছে। ফলে মৌসুমে বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদনের পর তা সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করা কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় কৃষি কার্যালয় ও কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ মৌসুমে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৬ টাকা। বস্তা কেনা এবং মাঠ থেকে হিমাগার পর্যন্ত পরিবহনে আরও গড়ে দুই টাকা খরচ হয়। প্রতি কেজি আলু হিমাগারে রাখতে ভাড়া দিতে হয় ৬ টাকা। সব মিলিয়ে উৎপাদন, পরিবহন ও সংরক্ষণ বাবদ কেজিপ্রতি ব্যয় দাঁড়ায় ২৪ টাকা। অথচ বর্তমানে হিমাগার গেটে সেই আলু গড়ে ১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে হিমাগারে সংরক্ষিত আলুতে কৃষকের কেজিপ্রতি লোকসান হচ্ছে ১২ টাকা। যদিও সরকার হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করেছে।
রংপুর কৃষি বিপণন কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০২৫–২৬ মৌসুমে জেলার ৪২টি হিমাগারে মোট ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে খাওয়ার আলু মজুত ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ মেট্রিক টন। একই মৌসুমে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ জন কৃষক ৬৬ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করেন। মোট উৎপাদন হয় প্রায় ১৯ লাখ ৫৭ হাজার টন।
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক মো. শাহজালাল ইসলাম বলেন, জনবলসংকটের কারণে আলু চাষে কৃষকের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কৃষকেরা যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তা স্পষ্ট।
গত সোমবার তারাগঞ্জের এনএন হিমাগারের সামনে কথা হয় লক্ষ্মীপুর গ্রামের আলুচাষি অহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও সেই দামে ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে হিমাগারে রাখা আলু নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
এর আগের দিন রোববার বদরগঞ্জের আমরুলবাড়ি গ্রামের ব্যাঙেরদোলা মাঠে কথা হয় কৃষক ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে। ২০১৪ সাল থেকে সাতবার আলু চাষে লোকসানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এবারও হিমাগারে ৩০০ বস্তা আলু রেখেছেন। কেজিপ্রতি ১২ টাকা লোকসান হলে সেই আলু হিমাগার থেকে বের করে বিক্রি করার অর্থনৈতিক যুক্তি দেখছেন না তিনি।
পীরগাছার অন্নদানগর গ্রামের কৃষক সাহেব আলী বলেন, লাভের আশায় বছরের পর বছর আলু চাষ করলেও ঋণের বোঝা বাড়ছে। চাষের খরচ তুলতে না পেরে দিন শেষে লোকসানই থাকছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার লালচাঁদপুর গ্রামের চাষি সেকেন্দার আলী বলেন, ২০২৪ সালে আলুর দাম বাড়ার সময় সরকারি কর্মকর্তাদের তৎপরতা ছিল। কৃষকদের দ্রুত আলু বিক্রিতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার লোকসান হলেও তাঁদের খোঁজ নিতে কেউ আসছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রংপুর বিভাগীয় আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যসচিব বিশ্বজিৎ বণিক বলেন, এবার ৪২ একর জমিতে আলু চাষ করে তিনি সাড়ে ৭ হাজার বস্তা আলু পেয়েছেন। পাশাপাশি লাভের আশায় আরও ১৭ হাজার বস্তা আলু কিনে হিমাগারে রেখেছেন। গত বছর প্রায় ৭০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবারও মূলধন হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে আলু চাষ থেকে সরে যাওয়ার চিন্তা করছেন তিনি।
ডিএইর রংপুর অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশের মোট আলু উৎপাদনের প্রায় ২৫ শতাংশ রংপুর অঞ্চলে হলেও এ এলাকায় উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। ফলে প্রতিবছরই আলু সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে কৃষকদের সংকটে পড়তে হয়। তাঁর মতে, আলুভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা এবং রপ্তানি বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
রংপুর কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, কৃষক যদি আলু চাষ করে উৎপাদন খরচও তুলতে না পারেন, তাহলে তাঁদের পরিবার নিয়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, রংপুরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. খায়রুল ইসলাম বলেন, আলু সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি কাঠামো উন্নত করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে কৃষকেরা আলু চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।
সর্বশেষ সংবাদ

নয়াদিল্লিতে এসএসি ও আইসিএআর-এর মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎ

সংবাদের লিংক কপি হয়েছে!