শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
কৃষি প্রবাহ

কৃষকের তালিকা নিয়ে টানাপোড়েন, অচল ‘কৃষকের অ্যাপ’

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৬ নভেম্বর ২০২৬ | ০৫:১৪ পিএম
কৃষকের তালিকা নিয়ে টানাপোড়েন, অচল ‘কৃষকের অ্যাপ’

আসন্ন অভ্যন্তরীণ আমন ধান সংগ্রহ ২০২৬-২৭ মৌসুমে সরকারি খাদ্যগুদামে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই ময়মনসিংহে দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলার ১৩টি উপজেলার কৃষি অফিসের কাছে প্রকৃত আবাদকারী কৃষকদের তালিকা চাওয়া হলেও তালিকা প্রস্তুত ও সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনীহা ও অসন্তোষ।

 

এর অন্যতম কারণ হিসেবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের অর্থায়নে তৈরি ‘কৃষকের অ্যাপ’ দীর্ঘদিন কার্যকর না থাকায় কৃষকদের ডিজিটালভাবে নিবন্ধনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি কৃষি অফিসের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ধান কেনা হয় না—এমন অভিযোগও রয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পরবর্তীতে লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হলেও তাদের প্রস্তুত করা তালিকার বড় অংশই উপেক্ষিত থাকে।

 

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর ময়মনসিংহে আমন ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল ২ হাজার ২৫৬ টন। জেলার ১৩টি উপজেলার ১৯টি খাদ্যগুদামে একযোগে এ সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে চলতি মৌসুমে আমন ধান সংগ্রহের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।

 

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ শাখা থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, আগামী নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া আমন সংগ্রহ কার্যক্রমে ‘অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা-২০১৭’ অনুসরণ করতে হবে। এ অনুযায়ী ইউনিয়নভিত্তিক প্রকৃত আবাদকারী কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে আগামী ২১ অক্টোবরের মধ্যে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।

 

তবে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষক নির্বাচন নিয়ে জটিলতা রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী কৃষক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে খাদ্য বিভাগের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘কৃষকের অ্যাপ’ এবং উপজেলা কৃষি অফিসের তৈরি আবাদকারী কৃষকদের তালিকা ব্যবহারের কথা।

 

ময়মনসিংহ সদর, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া, ত্রিশাল, গফরগাঁও, নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ, ধোবাউড়া, হালুয়াঘাট, ফুলপুর ও তারাকান্দাসহ জেলার ১৩টি উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকের মোবাইলে ‘কৃষকের অ্যাপ’ ইনস্টল করার পর সেটি চালু হচ্ছে না। সার্ভার ও কারিগরি সমস্যার কারণে অ্যাপটি দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত ব্যবহার অনুপযোগী বলে কৃষকদের অভিযোগ। এতে অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ থেকেও অনেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

 

অ্যাপের কার্যক্রমে সমস্যা থাকায় কৃষি অফিসের প্রস্তুত করা তালিকার গুরুত্ব আরও বাড়ার কথা থাকলেও সেখানেও রয়েছে অসন্তোষ। জেলার কয়েকজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, মাঠপর্যায়ে যাচাই করে প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ করতে তাদের অনেক সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। এনআইডি, মোবাইল নম্বর এবং ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করে তালিকা তৈরি করে খাদ্য বিভাগে পাঠানো হলেও ধান সংগ্রহের সময় সেই তালিকার সঙ্গে চূড়ান্ত কৃষক নির্বাচনের মিল পাওয়া যায় না।

 

একাধিক কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য, তাদের পাঠানো কয়েক হাজার কৃষকের তালিকা থেকে ৭০-৮০ শতাংশেরও বেশি নাম বাদ পড়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে অল্পসংখ্যক কৃষকের নাম রেখে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন দেখানো হয়। তাদের অভিযোগ, এর ফলে প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে মধ্যস্বত্বভোগী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুযোগ পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

 

এ কারণে চলতি মৌসুমে নতুন করে কৃষকের তালিকা তৈরির বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। কর্মকর্তাদের মতে, কৃষি বিভাগের তৈরি তালিকাকে যদি ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে বিবেচনা করা না হয়, তাহলে প্রতিবছর একই প্রক্রিয়ায় তালিকা তৈরির যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।

 

ময়মনসিংহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ৭০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে রোপা আমন ধানের আবাদ হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলায় কৃষকের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। তবে সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রির ক্ষেত্রে তালিকাভুক্তি ও বিভিন্ন হয়রানির অভিযোগ থাকায় অনেক কৃষক সেখানে ধান বিক্রিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

 

ময়মনসিংহের কয়েকজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে প্রকৃত আবাদকারী কৃষকদের তালিকা তৈরি করতে তারা যথেষ্ট শ্রম দেন। কিন্তু খাদ্যগুদামে ধান কেনার সময় সেই তালিকার প্রতিফলন না থাকায় কৃষকদের অসন্তোষের মুখে পড়তে হয় তাদের। একজন কর্মকর্তা বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পরও কৃষি বিভাগের কাছে কার্যকরভাবে বিষয়টি সমাধানের সুযোগ সীমিত থাকে।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, প্রতিবছর কৃষি বিভাগের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী সব কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হয় না। তার দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃষকদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়ার পর তাদের প্রাপ্য অর্থের পরিবর্তে মাত্র ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিয়ে বিদায় করে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়। আবার প্রকৃত কৃষক ধান নিয়ে গুদামে গেলে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়েন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

 

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ময়মনসিংহের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘কৃষকের অ্যাপের কারিগরি বিষয়টি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয়। আর প্রচলিত সংগ্রহ নীতিমালা অনুযায়ী উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমেই কৃষক চূড়ান্ত করা হয়। এখানে অনিয়মের সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, অ্যাপটি সারা বছর চালু থাকে না; নির্দিষ্ট সময় এলে সরকার এটি সক্রিয় করে।

 

স্থানীয় নাগরিক নেতা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, কৃষকের অ্যাপ কার্যকর না থাকা এবং কৃষি ও খাদ্য বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা সুবিধা নিতে পারে। এতে সরকারের কৃষকদের ন্যায্যমূল্য দেওয়ার উদ্দেশ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি দ্রুত অ্যাপটি সচল করার পাশাপাশি কৃষি অফিসের মাধ্যমে শনাক্ত করা প্রকৃত কৃষকদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তালিকাভুক্ত করার দাবি জানান।

 

আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম বলেন, ‘আমরা কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনলেও তাদের সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। এ কারণে কৃষি বিভাগের কাছ থেকে কৃষকদের তালিকা নেওয়া প্রয়োজন।’

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, আমন সংগ্রহ কার্যক্রম শুরুর আগেই কৃষক শনাক্তকরণ ও তালিকা প্রণয়নের বিষয়টি সমন্বিতভাবে সমাধান করা না গেলে সরকারি খাদ্যগুদামে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

সর্বশেষ সংবাদ

নয়াদিল্লিতে এসএসি ও আইসিএআর-এর মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎ

সংবাদের লিংক কপি হয়েছে!