খুলনার
পাইকগাছায় চলতি মৌসুমে রোপা আমন ধান চাষের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। অতিবৃষ্টিতে
বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, চারা রোপণের সময় বৃষ্টির স্বল্পতা, জমিতে জলাবদ্ধতা ও মাটির
লবণাক্ততার কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৫০ হেক্টর জমিতে কম আবাদ হয়েছে। এর সঙ্গে কৃষি
উপকরণ ও শ্রমিকের বাড়তি খরচ যুক্ত হওয়ায় ফলন ও লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।
আবার কিছু কৃষক ধান চাষের পরিবর্তে মাছ চাষে বেশি লাভের সম্ভাবনা দেখছেন।
উপজেলা
কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে পাইকগাছায় ১৩ হাজার ৩৩০ হেক্টর জমিতে আমন ধান
চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে আবাদ হয়েছে ১৩ হাজার ১৮০ হেক্টর জমিতে।
ফলে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে।
উপকূলীয়
উপজেলা পাইকগাছার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের জীবিকা কৃষিনির্ভর। এখানকার প্রধান ফসলগুলোর
মধ্যে আমন ধান অন্যতম। বর্ষাকালের বৃষ্টি ও জমিতে ধরে রাখা আর্দ্রতা কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা
এ ধান চাষ করেন। কিন্তু চলতি মৌসুমের শুরুতে অতিবৃষ্টি এবং পরবর্তী সময়ে বৃষ্টিপাত
কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক চাষাবাদে বিঘ্ন ঘটে।
কৃষি
অফিস সূত্রে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতে সময়মতো বীজতলা তৈরি করা হলেও অতিবৃষ্টির কারণে
কয়েক দফায় সেগুলো পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে নতুন করে চারা তৈরি করতে হয় কৃষকদের।
পরবর্তী সময়ে চারা রোপণের উপযুক্ত সময়ে বৃষ্টির অভাব দেখা দিলে অনেক জমিতে নির্ধারিত
সময়ে চারা লাগানো সম্ভব হয়নি। কোথাও রোপণ করা চারা মারা যাওয়ায় কিছু জমি অনাবাদি থেকে
যায়।
আমন
চাষে বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি জমিতে পানির ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত
বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে থাকলে চারা রোপণ ও গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। অন্যদিকে
পানির ঘাটতিতে নতুন লাগানো চারা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলের
মাটির লবণাক্ততা যুক্ত হয়ে ধানের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাইকগাছায় এসব
সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব পড়েছে আমন আবাদে।
পাইকগাছা
পৌর এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত
কৃষকদের বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয়। জমি চাষ, চারা রোপণ, সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার,
রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং ধান কাটার জন্য শ্রমিক নিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই
খরচ রয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় বীজতলা বা চারা নষ্ট হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায়। অথচ
শেষ পর্যন্ত ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে।
তার
মতে, কৃষি উপকরণের দাম ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য
নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে উপকৃত হবেন এবং ধান চাষে আগ্রহ ধরে রাখতে
পারবেন।
কৃষি
বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আবহাওয়াজনিত সমস্যা ছাড়াও জমির ব্যবহার পরিবর্তনের প্রবণতা
আমন আবাদে প্রভাব ফেলছে। কোনো কোনো এলাকায় ধান চাষের তুলনায় মাছ চাষে বেশি লাভের সম্ভাবনা
থাকায় কৃষকেরা বিকল্প পেশার দিকেও ঝুঁকছেন।
উপজেলা
কৃষি অফিসের ইউনিয়নভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, পাইকগাছার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় চলতি
মৌসুমে আমন ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে দেলুটি ইউনিয়নে সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ৭৪৫ হেক্টর
জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। গড়ইখালী ইউনিয়নে ২ হাজার ৩১৫ হেক্টর এবং চাঁদখালী ইউনিয়নে
১ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে।
এ
ছাড়া কপিলমুনি ইউনিয়নে ৮৮০ হেক্টর, লতা ইউনিয়নে ৮৭০ হেক্টর, লস্কর ইউনিয়নে ৮২০ হেক্টর,
হরিঢালী ইউনিয়নে ৮১৫ হেক্টর, গদাইপুর ইউনিয়নে ৫৯০ হেক্টর, সোলাদানা ইউনিয়নে ৫৮০ হেক্টর
এবং রাড়ুলী ইউনিয়নে ৫২৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছে। অন্যদিকে পৌরসভা এলাকায় এ
আবাদ হয়েছে ১৪০ হেক্টর জমিতে।
পাইকগাছা
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ একরামুল হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে কয়েক
দফায় বীজতলা নষ্ট হয়েছে। পরে চারা রোপণের সময় বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অনেক কৃষক
সময়মতো জমিতে চারা লাগাতে পারেননি। কিছু জমিতে রোপণ করা চারাও মারা গেছে। পাশাপাশি
উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা আমন চাষে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। এসব কারণেই
লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৫০ হেক্টর জমিতে কম আবাদ হয়েছে।
তিনি
আরও জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কৃষকেরা যাতে ভালো ফলন পেতে পারেন, সে জন্য কৃষি
বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জমির ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত জাত নির্বাচন,
সুষম সার ব্যবহার, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উৎপাদন অব্যাহত রাখতে কৃষকদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে যোগাযোগ ও পরামর্শ কার্যক্রমও চালু
রয়েছে।