শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
কৃষি প্রবাহ

“ফিডের দামে আগুন, কমছে খামারির উৎপাদন—বাড়ছে ডিম ও মুরগির বাজারদর”

নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৪০ এএম
“ফিডের দামে আগুন, কমছে খামারির উৎপাদন—বাড়ছে ডিম ও মুরগির বাজারদর”

নিজস্ব প্রতিবেদক:

পোলট্রি ও পশুখাদ্য তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশের পোলট্রি খাতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দুই দফায় পশুখাদ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন ছোট ও মাঝারি খামারিরা।

 


খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে প্রতি কেজি ফিডের দাম ছিল প্রায় ৬৮ টাকা। কয়েক দফা মূল্যবৃদ্ধির পর বর্তমানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফিড সর্বোচ্চ ৭২ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৪ টাকা বা প্রায় ৭ শতাংশ।

 

তবে ফিড উৎপাদনকারীদের বক্তব্য, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় ফিডের দাম সে হারে বাড়ানো হয়নি। ফলে উৎপাদনকারীদের অনেকেই এখনো কেজিপ্রতি ৩ টাকার বেশি লোকসান করছেন বলে দাবি করছেন।

 

ভুট্টা-সয়াবিনসহ প্রধান কাঁচামালের দাম ঊর্ধ্বমুখী

ফিড শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ফিড তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ ভুট্টার দাম প্রায় ২৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ডি-অয়েলড রাইস ব্র্যান বা ডিওআরবির দাম বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ এবং সয়াবিন মিলের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।


এ ছাড়া অন্যান্য প্রোটিনজাতীয় উপকরণের দামও বেড়েছে। ডলারের বিনিময় হার ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের কারণেও বিদেশ থেকে আনা কাঁচামালের খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

 

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশাররফ হোসেন চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, আগস্টে প্রতি টন সয়াবিনের দাম ছিল প্রায় ৪৩০ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৫৩০ ডলারে পৌঁছেছে।

 

তিনি জানান, ছোট ফিড মিলগুলোর পরিস্থিতি বিবেচনায় আগস্টের শেষ দিকে প্রতি কেজি ফিডের দাম ২ টাকা এবং সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি আরও ২ টাকা ৫০ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। এরপরও উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বর্তমান বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য হচ্ছে না।

 

কাঁচামালেই ব্যয়ের বড় অংশ

আকিজ ফিড মিলসের চিফ বিজনেস অফিসার এটিএম হাবিবুর রহমান জানান, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্রতি কেজি ভুট্টা ২৮–২৯ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও জুন থেকে আগস্টের মধ্যে দাম বেড়ে ৩৮–৪০ টাকায় ওঠে।

 

তার মতে, মানসম্মত ফিড উৎপাদনে মোট ব্যয়ের প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই কাঁচামাল সংগ্রহে ব্যয় হয়। ফলে কাঁচামালের দাম বাড়লে সরাসরি ফিড উৎপাদন খরচেও তার প্রভাব পড়ে।

 

উৎপাদন কমাচ্ছেন ছোট খামারিরা

ফিডের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন ছোট খামারিরা। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই মুরগির সংখ্যা কমিয়ে দিচ্ছেন।

 

গাজীপুরের মাওনা এলাকার কুতবাড়ি গ্রামের ব্রয়লার খামারি আমির হোসেন জানান, আগে তিনি মাসে প্রায় ৩০ বস্তা ফিড কিনতেন। বর্তমানে তা কমিয়ে ২৮ বস্তায় এনেছেন। একই সঙ্গে খামারে মুরগির সংখ্যাও কমিয়েছেন।

 

তার হিসাবে, বর্তমানে ৫০ কেজির এক বস্তা ফিডের দাম সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। কিন্তু ফিডের দাম বাড়লেও একই অনুপাতে মুরগির বিক্রয়মূল্য না বাড়ায় উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

 

সরকারের কাছে খামারিদের একাধিক দাবি

ফিডের দাম কমানো, আমদানি করা কাঁচামালের ওপর কর-শুল্ক ও ভ্যাট কমানো এবং ডিম-মুরগির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খামারিরা কর্মসূচি পালন করেছেন।

 

বাংলাদেশ মার্জিনাল পোলট্রি ফারমার্স কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান বলেন, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ডিওআরবি ও রাইস ব্র্যানের সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আমদানি করা কাঁচামালের ওপর কর, ভ্যাট ও শুল্ক কমানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি জোরদার করার দাবি জানান তিনি।

 

বাড়ছে ভোক্তা পর্যায়ের দামও

ফিডের মূল্যবৃদ্ধি ও খামার পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে খুচরা বাজারে। ঢাকার বাজারে গত শনিবার ফার্মের ডিম প্রতি ডজন প্রায় ১৫০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

 

অন্যদিকে আগস্টের আগে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ১৭০–১৮০ টাকা এবং ফার্মের ডিমের দাম ছিল প্রতি ডজন ১৩০–১৪০ টাকার মধ্যে।

 

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু জানিয়েছেন, পশুখাদ্যসহ পোলট্রি উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যয় কমাতে সরকার কাজ করছে। সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী দামে ডিম-মুরগি নিশ্চিত করতে উৎপাদন ব্যয় কমানোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

 

 

সর্বশেষ সংবাদ

নয়াদিল্লিতে এসএসি ও আইসিএআর-এর মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎ

সংবাদের লিংক কপি হয়েছে!